sarabangla logo
জীবন মানে জি বাংলা !!!

জীবন মানে জি বাংলা !!!

আমাদের এই প্রজন্মের (আমরা যারা) শৈশব -কৈশোর সবচেয়ে বেশি রঙিন হয়েছে 'ইত্যাদি, বিটিভির প্যাকেজ নাটক, আলিফ লায়লা, মুগলি, থিফ অফ বাগদাদ,ম্যাক গাইভার, রবিনহুড, হলে সিনেমা দেখা, ,বাংলাদেশ বেতারের 'অনুরোধের আসর গানের ডালি, তুষার খানের 'শুভেচ্ছা ',

অসাধারণ সব টিভি ধারাবাহিক, ছায়াছবির গান ছায়াছন্দ ,ফেরদৌস বাপ্পীর :কুইজ কুইজ, বহু আকাংখিত শুক্রবারের তিনটা পনের মিনিটের সিনেমা এরকম আরও বহু বহু, অসংখ্য অগনিত চমৎকার সব টিভি অনুষ্ঠানের হাত ধরে। মোটামুটি তীর্থের কাকের মতো আমরা অপেক্ষা করতাম এসব প্রোগ্রামের জন্য।

কখন শুরু হবে, তারও অনেক সময় আগে আমরা টিভির সামনে ভুভুক্খের মতো বসে থাকতাম। আজকের এইসময়ে দাড়িয়ে হয়তো এব কথা গুলা অনেক টা গল্পের মতো শুনায়! অথচ এমনটায় হয়েছে সেসময়। বরং আমাদের বয়োজৈষ্ঠরা গল্প করতো তাদের অল্প বয়সে কতশত চমৎকার প্রোগ্রাম তারা টিভিতে দেখেছি,, আমরা নাকি তার কিছুই দেখেনি।।

এ বাস্তবতা চরম সত্য!! কত অসাধারণ ছিলো সেসব টিভি প্রোগ্রাম, আহারে!!! এখানে সবচেয়ে বড় যে ডিবেটটা হলো সেটা হচ্ছে,, সেসময়কার টিভি অনুষ্ঠান এতো চমৎকার ছিল, এতো গ্রহনযোগ্য ছিলো, কারণ চ্যানেল ছিলো একটা,, BTV মানুষের অপশন ছিলো না, তাই সবাই সব অনুষ্ঠান এতো আগ্রহ, আনন্দ নিয়ে দেখতো,

এটা এড়িয়ে যাবার উপায় নাই,, তবে এটা যদি সত্য হয় তবে মুদ্রার অপর পিঠ হলো সেসময়কার অনুষ্ঠানের 'মান'ও ছিলো অসাধারণ, পরিচালক, প্রযোজক অনেক যত্ন, ভালোবাসা নিয়ে অনুষ্ঠান প্রচার করতো,তাদের চেতনা যতটানা ব্যানিজ্যিক ছিলো তার চেয়ে ঢের গুণ বেশি ছিলো শৈল্পিক এবং আন্তরিক। নিশ্চয় সেসময় একটা টিভি প্রোগ্রাম করতে প্রযোজকদেরও গিঁটের টাকা খরচ করতে হতো!! তাহলে, প্রশ্ন টা উহ্যই রয়ে যায় ...

সময় বদলে গেছে, বদলেছে পৃথিবীর চিত্রটাও!! বিশ্বায়ন আর মুক্ত আকাশ সংস্কৃতির এই গ্লোবাল ফেনোমেনাটা ঠিক আর পূর্বের মতো নাই। স্যাটেলাইট এর এই ইরাতে আশি আর নব্বই দশকের তুমুল জনপ্রিয় বিটিভির পাশে একুশে, চ্যানেল আই, এটিএন বাংলা রা ঘাপটি মেরে আসন পেতেছে!!

ততক্ষণে পলাশীর প্রান্তরের ন্যায় সিরাজদৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যেমন বাংলার স্বাধীনতা অস্তগামী ঠিক তেমনিভাবে ডিশ এ্যান্টেনা আর স্যাটেলাইট চ্যানেল 'বিটিভি 'র সোনালি সময়ে কফিনে শেষ পেরেক মারতে বসেছে। লাভের হিসেবটা পাগলেও বুঝে,, ব্যাণিজ্যিক তকমাটা তাই বিটিভিও গায়ে লাগিয়েছে, তাই তখন থেকে আর তিনটা পনেরতে সিনেমা শুরু হয় না, প্যাকেজ নাটক গুলোর মাঝের বিরতির সময় টা যেন ইহকালে আর শেষ হয় না,

ছায়াছন্দ গুলা আর মধুর লাগেনা। আর বেসরকারি টিভি চ্যানেল!! তাদের কথা আর বলতে হয়!! এরা তো মাশাল্লাহ এদিক দিয়ে হাজার কাঠি ওপরে। একটা চ্যানেল একটা ব্যানিজ্যিক বাক্স ছাড়া আর কিছু না। এদের টিভি অনুষ্ঠানের মান, থুথু ফেলতেও ইচ্ছা হয় না, একটা প্রোগ্রাম দেখতে বসলে সেটা দেখে শেষ করে আর ওঠা যায় না, এত পরিমান এ্যাড দেয়া হয় যে একটা সময় আমরা ভুলে যাই,, কোথায় যেন ছিলাম???!!

একবার ইত্যাদি 'র উপস্থাপক #হানিফ_সংকেত ব্যাঙ্গ করে বলেছিল :' একটা সময় আমরা অনুষ্ঠানের ফাকে ফাকে বিজ্ঞাপন দেখতাম আর এখন বিজ্ঞাপনের ফাকে ফাকে অনুষ্ঠান দেখি "। গুনির জ্ঞানী কথা। যথার্থই বলেছেন তিনি। আর এই বিজ্ঞাপন যন্ত্রনার জন্য বলির পাঠা হতে হয় বেচারা রিমোটের!!! প্রতিটা চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে রিমোটের বাটনের ওপর যাঁতাকলের মতো অত্যাচার চলতে থাকে,, একটা সময় আমরা ক্লান্ত হয়ে ওঠি,,

মুখ ফিরিয়ে নেই আমাদের অনুষ্ঠান গুলো হতে,, খুজতে থাকি বিকল্প কিছু,, তা যতই অখাদ্য হউক না কেন!! একটা সময় এসে আমরা পেয়েও যায় :-) ঠিক তখনই ঘটে নাটকের সবচেয়ে বড় ক্লাইমেক্সে। ঠিক তখনই এমন কিছু হয়, যার জন্য হয়তো কেউ কখনো প্রস্তুতও ছিলো না।

আমার নিজের বড় বোন, আমার চাচাতো বোন, দুই খালাত বোন, তিন ভাবি,, যাদের কথা বললাম এরা প্রত্যেকেই কোন না কোন ইন্ডিয়ান চ্যানেলে প্রচারিত সিরিয়ালের পোকা!! হয়#স্টার_প্লাস#সনি,#জি_টিভি না হয় কলকাতার :#স্টার_জলসা, এবং #জি_বাংলা বলতে এরা পাগল প্রায়।। প্রতিটা সিরিয়াল এরা দেখে, সরি শুধু দেখে না বলা চলে এরা #গিলে। যখন সিরিয়াল শুরু হয় রিমোট টা দুহাতে শক্ত করে ধরে রাখে,

কেউ যেন না নিতে পারে। এক চ্যানেলে একটা শেষ হয়তো আরেক চ্যানেলও অন্য টা দেখা শুরু করে। প্রতিটা চ্যানেলের প্রতিটা সিরিয়ালের সময়সূচি, কাহিনী এদের মুখস্থ,, এমনকি রিপিট টেলিকাস্ট দেখেও এরা তৃপ্তির ঢেকুর গিলে!!!! এগুলো সুখের কথা নয়,, বরং ভেবে দেখুন ব্যাপার গুলা ভয়ংকর!! অনেক বেশি ভয়ংকর!!

এবং মজার বিষয় হলো আমি কেবল আমার বোন -ভাবি কথা বললাম,, অপ্রিয় হলেও সত্য এই চিত্র এদেশের প্রতিটা ঘরে ঘরে!! রিকশাওয়ালা থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া স্টুডেন্ট এমনকি রাষ্ট্রীয় উচ্চ পর্যায়ের সকলে।। শিক্ষিত -অশিক্ষিত, ধনী -গরীব, ছোট -বড় ছেলেমেয়ে প্রায় সবাই এই কাতারের শামিল।

কী বিভীষিকাময় ব্যাপার!! সর্বস্তরের লোকজনের একটা অন্ধকারের দিকে ছুটছে অথচ কেউ এতোটুকুন বুঝতেও পারছে না!! ভাবা যায়?? তার চেয়েও ইন্টারেষ্টিং বিষয় হলো, খেয়াল করবেন যারা এসব ইন্ডিয়ান চ্যানেলে প্রচারিত সিরিয়াল গুলো নিয়মিত দেখে, এরা এসব প্রোগ্রামের একপ্রকার "প্রমোট 'করে বেড়ায়।

আপনাকে প্রলোভন দেখাবে এভাবে ''জানিস স্টার জলসা য় #বোঝে_না_সে_বুঝেনা 'র নায়িকা #পাখির মনে যে কী দুঃখ!! মেয়েটা এতো ভালো অথচ ওর হাজব্যান্ড ওকে শুধু ধমকায়! !তুই একদিন দ্যাখ,, অনননননেক ভালো লাগবে। " আমার শরীর -কলিজা জ্বলে ওঠে অথচ এভাবেই এদের ব্র্যান্ডিং টা শুরু হয়!!! আর এই ব্র্যান্ডিংটা আরম্ভ করে আমাদের এপারের শিক্ষিত শ্রেনী গুলো!!

একসময় ভয়ঙ্কর রাগ হতো, ভারি বিরক্ত হতাম আমি,, যে মেয়ে গুলো স্টার জলসা, জি বাংলা কিংবা হিন্দি চ্যানেলের সিরিয়াল দেখে এদের "ব্যক্তিত্বহীন -মূর্খ মনে হতো!! কিন্তু খুব ঠান্ডা মাথায়, সুক্ষ্মভাবে ভেবে দেখেছি,, আমাদের মা,চাচি, বোন, ভাবি, ভাই, বান্ধবী, স্ত্রী রা কেন এই সিরিয়াল গুলোর দিকে এরকম নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো ঝুঁকছে?? কি এতো সুখ এদের এসব অখাদ্য সিরিয়ালে,,

কি এমন আছে এসব সিরিয়ালে যার জন্য এরা বাংলাদেশের কোন চ্যানেলের কোন নাটকের খবর জানেনা অথচ প্রতিটা ভারতীয় সিরিয়াল ঠোঁটের আগায় মুখস্থ!! জবাব টা খুব সহজ, খুব স্ট্রেইট।। আপনি আধা ঘণ্টার একটা নাটক দেখতে গিয়ে নিশ্চয় দুই ঘন্টা বসে থাকবেন না,

দু ঘন্টার একটা সিনেমা দেখতে গিয়ে আর যাই হউক তিন ঘন্টার বিরক্তিকর অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন সহ্য করবেন না। যে গার্মেন্টস কর্মী টা সারাদিন গাধার খাটুনি খেটে রাতে রিমোট নিয়ে বসে নিশ্চয় বোরিং এ্যাড দেখে নাটক দেখার খায়েস মেটাবে না। এর চেয়ে ভালো, শুধু ভালো না হাজার গুন ভালো,, #পাখি#কিরনমালা কিংবা স্টার ওকে, লাইফ ওকে, স্টার প্লাস, সনি, জি টিভি তে অভিনীত চরিত্র গুলোকে "

মাঝরাতে গলায় -কানে সোনার গহনা পরে ওয়াশরুমে যেতে।। অন্তত ওদের দেখে আমাদের দুঃখী জীবনে তো মনে হবে,, 'আহারে জীবন কত সুখের!!! খুব বেশি দিন আগের কথা না, গতবছর রোজার ঈদের ঘটনা :সবারই মনে থাকার কথা,, #পাখি ড্রেস কিনতে না পেরে আত্মহত্যা করেছে। বাবা /স্বামী পাখি ড্রেস কিনে দেয়নি বলে গলায় ফাসি দিয়েছে।

বাঙ্গালী জাতির অভিমান আছে মাইরী।। তাহলে চিন্তা করুন কত স্ত্রী না জানি তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করেছে এনিয়ে,, কত কিশোরী রাগ -অভিমান করে তার বাবা -মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করেছে?? না জানি কত প্রেমিক ভিক্ষুক হয়েছে,, সংসার ভাঙার হিসেব টা আড়ালেই রয়ে গেলো।।

# গতবছর "প্রথম আলোর " শেষের পাতায় একটা নিউজ দেখেছিলাম এমন : ময়মনসিংহের নান্দাইলে এবং ভৈরবে প্রাইমারি স্কুলের যেসব খাতা বিক্রি হয় সেইসব খাতার সামনে#স্টার_জলসায় প্রচারিত "বুঝে না সে বুঝে না 'র নায়িকা "পাখির ' ছবি এবং #কিরনমালারনায়িকা ছবি সম্বলিত আছে,, এবং ছেলেমেয়েরা সেসব খাতা কিনছে,

এবং সেসব নিয়ে স্কুলে যাচ্ছে!! আর সেই খাতার ওপর লিখা "রুপকথার রাজকন্যা কিরনমালা কি পারবে অচিনপুরের সুখ ফিরিয়ে আনতে??? মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চন মাইরি।। এইসব কোমলমতি শিশুরা ক্লাসের ফাকে ভাবতে বসে যাবে,, পারবে তো কিরনমালা?

আমি ছোট মানুষ, কিন্তু এই দেশটা নিয়ে অনেক বড় করে স্বপ্ন দেখি। হয়তো সেরকম স্বপ্ন দেখা মানায় না , তবুও মাঝমধ্যে এসব দেখে -শুনে বুকের ভিতরে একপ্রকার তীব্র হতাশা অনুভব করি। আমরা ঠিক যাচ্ছি কোনদিকে?? একটা দেশের কাঁচা -নিরেট চেতনায় যখন ভুল আর অশুদ্ধ জিনিস ঢুকিয়ে দেয়া হয় ওই জাতি তখন পথ হারাবেই।

হৃদপিণ্ড দিয়ে বিশ্বাস করি কোন একদিন এদেশের অনেক কিছুই বদলে যাবে,, আমাদের মনন -মস্তিস্কের দেয়ালে যে ঘুণেপোকা বাসা বেঁধেছে,, সেই ঘুণেধরা বাসাটা একদিন তাসের ঘরের মতো ভেঙে তছনছ হয়ে যাবে।। শুধু ভয় হয় : যেন দেরি না হয়!!!