sarabangla logo
শরনার্থী সংকটে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় ও পশ্চিমা রাষ্ট্রসমুহের প্রতিক্রিয়া: বিংশ শতাব্দী

শরনার্থী সংকটে সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় ও পশ্চিমা রাষ্ট্রসমুহের প্রতিক্রিয়া: বিংশ শতাব্দী

শরনার্থী সংকট বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেও এই সংকট  প্রাচীন কাল থেকেই পৃথিবীতে বিদ্যমান ছিল। যুগে যুগে অসংখ্য মানুষ নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও দূর্ভিক্ষ পীড়িত অঞ্চল থেকে বিভিন্ন গোত্র, রাজ্য, জাতিরাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের আশ্রয় গ্রহন করেছিল।

এরই পরিপেক্ষিতে আমরা গত কয়েক বছরের মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখি যে, পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য মধ্যপ্রাচ্যকে রাজনৈতিক ভাবে অস্থিতিশীল করে রেখেছে। নিজেদের চাহিদা অনুযায়ী যুদ্ধ ও সংঘর্ষ পরিচালনা করছে। আর এই যুদ্ধ ও সংঘর্ষ মধ্যপ্রাচ্যের মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে এবং মধ্যপ্রাচ্য বসবাসের অনুপযোগী হয়েছে।

এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যের মানুষ একটুকরো নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে বলকান অঞ্চল ও ভূমধ্যসাগরের বিশাল উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যদিয়ে দুঃসাহসিক যাত্রা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করছে না। মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপে প্রবেশের ক্ষেত্রে তারা দুটি রুটকে অনুসরন করছে। একটি হল ভূ-মধ্যসাগর হয়ে ইটালি ও মাল্টাতে প্রবেশ করা।

অপরটি হল বলকান রুট। অর্থ্যাৎ তুরস্ক থেকে ইজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে গ্রীসে প্রবেশ করা। পূর্বে এই সংকট মহামারী কার ধারণ না করলেও বর্তমানে (২০১৪-২০১৫ সালে) মহামারী আকার ধারণ করেছে। এত বিশাল শরণার্থী সংকট পৃথিবী আর কখনও দেখেনি। যা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণের বাহিরে বলে মনে করা হয়।

জাতিসংঘের উদ্বাস্তু কমিশনের হিসাব মতে, চলতি বছরে ভূমধ্য সাগর পাড়ি দিতে গিয়ে জাহাজ ডুবে মৃত্যুবরণ প্রায় ২ হাজার ৬০০ শরণার্থী। এমনই এক প্রচেষ্টায় মর্মান্তিক বলি হয়েছে তিন বছরের শিশুপুত্র আয়লান কুর্দি। তুরস্কের বোদরাম থেকে গ্রীসের কস দ্বীপে পৌঁছানোর উদ্দ্যেশ্যে যাত্রা শুরু করলে এই দুর্ঘটনা ঘটে।

পরবর্তীতে বোদরাম শহরের কাছে আকিয়ারলার সৈকতের ভেজা বালুতে তার নিথর দেহটির ছবি প্রকাশের মাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে আসেন তুরস্কের ফটো সাংবাদিক নিলুফার দেমির। এই ছবিগুলো মানবতার মহাবিপর্যয়কেই ইঙ্গিত করেছিল। বিশ্ব মানবতা আজ সাগর তীরের বালি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।

যার মাধ্যমে বিশ্বের নেতৃবৃন্দের টনক নড়ে। যদিও পূর্বে আয়লানের মত কত নিষ্পাপ হাস্যোউজ্জ্বল প্রাণ বলি হয়েছে তার খবরও কেউ রাখেনি। “সিরীয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যন রাইটস” এর ভাষ্য মতে- মার্চ ২০১১ সালের পর থেকে সিরীয়ার যুদ্ধে তিন লাখ বিশ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে মোট ১৫ লাখ।

 দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। ২০১৪ সালে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৭ জন এবং ২০১৫ সালে প্রায় ৪ লাখ শরণার্থী ইউরোপে প্রবেশ করেছে। সিরীয়ার পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তাদের সাধ্যমতো শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে এবং প্রয়োজনীয় সাহায্য সহযোগীতা করে আসছে।

মধ্যপ্রাচ্যে শরণার্থী আশ্রয়দানের তালিকার শীর্ষে রয়েছে তুরস্ক, লেবানন ও জর্ডান। তুরস্ক ২০ লাখ, জর্ডান ১০ লাখ শরণার্থী আশ্রয় দিয়েছে। অপরদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের ধনীদেশ হিসেবে খ্যাত সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান এই সংকটে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে।

যদিও ২০১১ সালে সৌদি আরব সিরীয় ৫ লক্ষ্য শরনার্থীকে শ্রমিক হিসেবে আশ্রয় দিয়েছিল। তুরস্ক লেবানন জর্ডানের শরণার্থী শিবিরগুলোতে জীবনযাত্রা দূর্বিসহ হয়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলো শরণার্থী আশ্রয় দেওয়ার ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন নীতি গ্রহন করেছে। জার্মানী ও অস্ট্রিয়া ব্যাতীত অন্য রাষ্ট্রগুলো শরণার্থী আশ্রয়ের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানে রয়েছে।

তবে শরণার্থী সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ইউরোপীয় দেশগুলোর সংগঠন ইইউ ব্রাসেলসে এক জরুরী বৈঠকে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে ১ লক্ষ ৬০ হাজার শরণার্থীকে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে বন্টন করে দিয়েছে। যদিও জাতিসংঘ সমালোচনা করে বলেছে যে, এই কোটা পদ্ধতি সংকট সমাধানে যথেষ্ট নয়।

পূর্ব ইউরোপের রাষ্ট্রগুলো প্রথম থেকেই কোটা পদ্ধতির বিরোধীতা করছে এবং শরণার্থী প্রবেশের জন্য জার্মানীর সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়া নীতির তীব্র সমালোচনা করেছে। শরণার্থী সংকটে সবচেয়ে বড় অবদান রাখতে যাচ্ছে জার্মানী। বর্তমানে জার্মানীতে শরণার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ। তারা আরও শরনার্থী আশ্রয় দানের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এ ব্যাপারে পরিচালিত এক জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ (৬৬%) ভোটও এর পক্ষে পড়েছে। শরণার্থীদের আশ্রয় ও বসত বাড়ি নির্মাণের জন্য ৬০০ বিলিয়ন ইউরো খরচের ঘোষনা দিয়েছে জার্মান সরকার। আগামী বছর এই খাতে আরও তিনশ বিলিয়ন ইউরো বরাদ্দ দেয়া হবে বলেও জানানো হয়।

অপরদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ১০ হাজার শরণার্থী আশ্রয় দেবে। যদিও তার ২০১১ সালে ১৫০০ সিরীয় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। ২০১৬ অর্থ বছরে ১ লক্ষ শরণার্থীকে আশ্রয় দিবে বলে জানিয়েছে। অস্ট্রিয়া প্রথম দিকে শরণার্থী আশ্রয় দিলেও বর্তমানে হাঙ্গেরীর সাথে রেল যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছে।

শরণার্থী প্রবেশ ঠেকাতে জরুরী ভিত্তিতে হাঙ্গেরীর সরকার সার্বিয়ার সীমান্তে ১৭১ কিলোমিটার কাটাতারের দেয়াল নির্মাণ করেছে। প্রথম থেকেই শরণার্থী হাঙ্গেরীতে জড়ো হচ্ছিল। এর মুল কারন হলো “শেঙ্গেন জোন” যা ইউরোপীয়ান ইউনিয়ন ভুক্ত ২৬ দেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। যেগুলোর একটিতে প্রবেশ করলে অন্যগুলোতে ভিসা ছাড়াই প্রবেশ করা যায়।

যদিও শরণার্থীদের মূল পছন্দ হল জার্মানী। এই সুযোগে হাঙ্গেরী শরণার্থীদের সাথে অমানবিক আচরণ করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের দিকে খাবার ছুড়ে মারা হচ্ছে এবং শিখ নির্মিত গৃহে আবদ্ধ করে রেখেছে। এটাকে অনেকেই “ইউরোপীয় গোয়েন্তানামো বে” বলে আখ্যায়িত করেছেন।

এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করে অস্ট্রিয়ার চ্যান্সেলর ওয়ের্নার ফেম্যান বলেছেন- শরণার্থীদের সঙ্গে হাঙ্গেরীর আচরণ আমাকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ইউরোপের অন্ধকার দিনগুলোর কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। ব্রিটিশরা প্রথম দিকে শরণার্থী গ্রহণের ব্যপারে কঠোর অবস্থানে থাকলেও পরবর্তীতে তাদের নীতির কিছুটা পরিবর্তন করে।

তারা চার বছরে ৫ হাজার করে বিশ হাজার শরণার্থী আশ্রয়ের গোষনা দিয়েছে। ফ্রান্স ইউরোপীয় ইউনিয়নের বন্টিত ৩০ হাজার শরণার্থী্কে আশ্রয় প্রদান করবে। ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য গৃহীত পদক্ষেপ সমুহ মধ্যপ্রাচ্যের শরণার্থী সংকটের তুলনায় খুবই সীমিত। 

অদূর ভবিষ্যতে শরণার্থীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা যায়। এর কারন হিসেবে আই এস এর সম্প্রসারন, কুর্দিদের উপর তুরস্কের বোমা নিক্ষেপ, রাশিয়া কর্তৃক আসাদ বাহিনীকে অত্যাধুনিক সামরিক সহায়তা দান, সিরীয়ার বিরোধীদেরকে পশ্চিমাদের সহায়তা দান, পশ্চিমাদের আই এস ভীতি এবং ইসরায়েলের মধ্যপ্রাচ্য নীতি ইত্যাদি উল্লেখ করা যায়।

যুদ্ধ সংগাত বাড়ার সাথে সাথে শরণার্থী সংকটও বৃদ্ধি পাবে এবং মানবতা অধিকহারে পদদলিত হবে। আয়লান কুর্দির নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে বর্তমান বিশ্বের মানবতাকে পরিমাপ করা যায়। পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থ সংরক্ষনে মানবতা আর কতটুকু সংকোচিত হবে এই প্রশ্ন বিদ্ধ করছে পুরো মানবতাকে। শরণার্থী সংকট বৃদ্ধির সাথে সাথে সমাধানের জন্য পশ্চিমা বিশ্ব কতটুকু উদ্যোগী হতে পারে সেটাই দেখার বিষয়।