দেবী দুর্গার গাত্রবর্ণ ফর্সা না কালো?

ধর্ম ডেস্ক:
Published:  2016-10-08 07:55:32

দেবী দুর্গার গাত্রবর্ণ ফর্সা না কালো?

এক কথায় এই জিজ্ঞাসার মীমাংসা করা অসম্ভব! কেন না দুর্গা- এই নামটির সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে বহু শক্তিদেবীর রূপভেদ।

তাঁদের একেকজনের বর্ণ একেকরকম, বাহুর সংখ্যায় রয়েছে তফাত, তফাত রয়েছে অস্ত্রেও!
তাহলে?

দুরূহ এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে দেবীমাহাত্ম্য বা শ্রীশ্রীচণ্ডী নির্দেশিত পথেই। সেই গ্রন্থ অনুসারেই খুঁজে নিতে হবে দেবীর নানা সময়ে আবির্ভাব এবং রূপবৃত্তান্ত।

নীলবর্ণা যোগনিদ্রা


শ্রীশ্রীচণ্ডীর প্রথম অধ্যায়ে আমরা দেখছি বিষ্ণুর মধু-কৈটভ বধের কথা। প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট কারণ-সমুদ্রে পরিণত হলে বিষ্ণু সেই সমুদ্রের উপর অনন্তনাগকে শয্যা করে যোগনিদ্রায় মগ্ন হলেন।

এই সময় বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়ে বিষ্ণুর নাভিপদ্মে স্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হল। ভীত হয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জাগরিত করবার জন্যে যোগনিদ্রার স্তব করতে লাগলেন।

এই স্তবে সন্তুষ্টা হয়ে দর্শন দিলেন দেবী যোগনিদ্রা, মতান্তরে দুর্গা। তিনি বিষ্ণুকে জাগরিত করলে পাঁচ হাজার বছর ধরে মধু ও কৈটভের সঙ্গে মহাসংগ্রামে রত হলেন শ্রীভগবান।

কিন্তু, সেই দুই মহাপরাক্রমশালী দৈত্যকে পরাস্ত করতে পারলেন না। অতঃপর এই দেবীই বিষ্ণুর দৈত্যবধের সহায়ক হলেন। তিনি মায়াবলে মোহাচ্ছন্ন করলেন দুই দৈত্যকে।

তারা প্রার্থনা করল বিষ্ণুর হাতে নিজেদের মৃত্যু! এভাবেই দেবীর সাহায্যে মধু-কৈটভকে বধ করতে সক্ষম হলেন বিষ্ণু।

লক্ষ্যণীয়, এই যে বিষ্ণুমায়া বা যোগনিদ্রা বা যোগমায়ার আবির্ভাব হল, তাঁর গাত্রবর্ণটি কিন্তু ঘন নীল। আমরা যেরকম তপ্তকাঞ্চনবর্ণা অর্থাৎ সোনার মতো গায়ের রং দেখি দেবীর, আদপেই তা নয়!

কৃষ্ণবর্ণা কৌষিকী


এর পরে দেবী দ্বিতীয়বার আবির্ভূতা হচ্ছেন কংসের কারাগারে। বিষ্ণুকে কংসবধে সাহায্য করার জন্য দ্বাপর যুগে দুর্গা এক শিশুরূপে ভূমিষ্ঠ হলেন যশোদার গর্ভ থেকে। বসুদেব কৃষ্ণকে নন্দালয়ে রেখে সেই কন্যাকে নিয়ে এলেন কারাগারে, তুলে দিলেন কংসের হাতে।

কংস যখন শিশুটিকে পাথরে আছড়ে হত্যা করতে উদ্যত, তখন ঘটল এক অলৌকিক কাণ্ড। সেই শিশুকন্যা কংসের হাত ছাড়িয়ে উঠে গেল শূন্যে।

এবং প্রকট হলেন অষ্টভুজা দুর্গা। কংসকে কে বধ করবে, সেই দৈববাণী সেরে তিনি চলে গেলেন বিন্ধ্যাচলে। হলেন বিন্ধ্যাচলনিবাসিনী। এই দেবীও কিন্তু গৌরবর্ণা নন, বরং তিনি কৃষ্ণবর্ণাই!

কৃষ্ণবর্ণা মহিষমর্দিনী


এর ঠিক পরের ঘটনাই মহিষাসুর বধ। যখন মহিষাসুরের অত্যাচারে ত্রস্ত হয়ে উঠেছেন দেবগণ, তাঁরা যখন ব্রহ্মা ও শিবকে নিয়ে প্রতিকারের আশায় দ্বারস্থ হলেন বিষ্ণুর, তখন সম্মিলিত দেবোতেজ থেকে জন্ম নিলেন দেবী দু্র্গা।

এবার এই দেবীর গাত্রবর্ণটি কেমন দেখছি আমরা? সেটা অন্তত শ্রীশ্রীচণ্ডীতে খুব একটা স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি।

দেবতারা যখন মহিষাসুর বধের পর করজোড়ে স্তব করছেন দেবীর, তখন একটা আবছা বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে শুধু।

দেবতারা সেই স্তবে দেবীর অপরিমিত শক্তিরই প্রশংসা করছেন। বলছেন, হে দেবী, আপনার মুখে চাঁদের লাবণ্য।

দুর্ধর্ষ মহিষাসুর আপনার মর্মস্থলে আঘাত করলেও সেই লাবণ্য এতটুকু ম্লান হয়নি, আপনি শুধু ঈষৎ হেসেছেন সেই প্রহারে।

এটিই আমাদের সবচেয়ে বিস্মিত করেছে! এই চাঁদের মতো লাবণ্য থেকেই অনেকে অনুমান করে নেন, দেবী দুর্গা গৌরবর্ণা।

কিন্তু, এই দুর্গারই এমন অনেক মূর্তি ও চিত্র আমরা দেখব, যেখানে তিনি কৃষ্ণবর্ণা। যুক্তি এই- চাঁদের মতো লাবণ্য কি কৃষ্ণবর্ণে থাকতে পারে না?

নীলবর্ণা কৌষিকী


দেবীর এই কৃষ্ণবর্ণা হওয়ার যুক্তি আরও একটু প্রবল হয় ঠিক এর পরের ধাপে, যখন শুম্ভ-নিশুম্ভের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন দেবতারা।

তাঁরা প্রতিকারের জন্য খুঁজছেন মহিষমর্দিনীকে। কিন্তু, তিনি মহিষ-বধের পর থেকেই অন্তর্হিতা। কোথাও তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এমতাবস্থায় দেবতারা হিমালয়ের এক স্থানে গিয়ে শুরু করলেন সেই বৈষ্ণবী মহাদেবীর স্তব। এবং, দেবতাদের সেই আর্তি কানে গেল দেবী পার্বতীর।

তিনি তখন স্নান সেরে ফিরছিলেন বাড়ির পথে। দেবতাদের দেখে কৌতূহলী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন পার্বতী। জানতে চাইলেন, তাঁরা কার স্তব করছেন?

পার্বতী এই প্রশ্ন করা মাত্রই তাঁর শরীরকোষ থেকে নির্গতা হলেন এক দেবী। তিনি বললেন, এই দেবতারা আমারই স্তব করছেন!

এবং দেবতাদের শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের আশ্বাস দিয়ে তিনি চলে গেলেন হিমালয়ের আরেক স্থানে। দেবী পার্বতীর কোষ থেকে নির্গতা হয়েছেন বলে তাঁর নাম কৌষিকী।

এই দেবী কৃষ্ণবর্ণা, তাই তাঁকে কালিকা নামে আখ্যা দেওয়া হল- তস্যাং বিনির্গতায়ান্তু কৃষ্ণাভূৎ সাপি পার্বতী/কালিকেতি সমাখ্যাতা হিমাচলকৃতাশ্রয়া।

দেবীভাগবত আবার বলছে এই কৌষিকীর গায়ের রং কালির মতো কালো এবং তাঁকে দেখলেই দৈত্যরা ভয় পায়- মসীবর্ণা মহাঘোরা দৈত্যানাং ভয়বর্ধিনী।

কৃষ্ণবর্ণা আদ্যাশক্তি


এখানেই শেষ নয়। শুম্ভ-নিশুম্ভের সঙ্গে যুদ্ধে যখন কৌষিকীকে আক্রমণ করবেন চণ্ড এবং মুণ্ড নামে দুই অসুর সেনাপতি, তখন কৌষিকীর ভ্রুকুটি-কুটিল ললাটদেশ থেকে উৎপন্না হবেন দেবী চণ্ডিকা, মতান্তরে কালী।

বলাই বাহুল্য, তাঁর গায়ের রংটিও কালো! চণ্ড এবং মুণ্ডকে বধ করে যিনি পরিচিতা হবেন চামুণ্ডা নামে।

আর যদি দেবী পার্বতীর সঙ্গেই খুব সরল হিসাবে এক করে দেখতে হয় দুর্গাকে? তাহলে দেখব, পার্বতীও কৃষ্ণবর্ণা। কালিকাপুরাণ বলছে, জন্মের পর নীলপদ্মের মতো শ্যামবর্ণা শিশুকন্যা দেখে পিতা হিমালয় তার নাম রাখলেন কালী।

বরাহ পুরাণ বলছে, সতী যজ্ঞাগ্নিতে আত্মাহুতি দিয়ে পরের জন্মে পার্বতী রূপ ধারণ করেন, তাই যজ্ঞের আগুনে পুড়ে তিনি কৃষ্ণবর্ণা।

আবার বামন পুরাণও বলছে পার্বতী কালো, কাজলের মতো তাঁর গায়ের রং!
তাই যদি হয়, তবে বঙ্গের পূজায় দুর্গার মূর্তি উজ্জ্বল সোনার মতো কেন?

কৃষ্ণবর্ণা গণেশজননী


এই রহস্য লুকিয়ে আছে দুর্গামূর্তি তৈরির সনাতন বিধানে। সেখানে বলা হয়েছে, দেবীর গায়ের রং অতসী ফুলের মতো। এবার মজার ব্যাপার হল, অতসী ফুল বঙ্গের একেক স্থানে একেক রঙে ফোটে।

বেশির ভাগ জায়গাতেই তা সোনালি, তাই বঙ্গের মূর্তিতে দুর্গার গায়ের রং সোনার মতো! কিছু কিছু জায়গায় অতসী ফুল নীল, সেইসব জায়গায় দুর্গামূর্তিও নীল বা কৃষ্ণবর্ণা!

সূত্র: সংবাদ প্রতিদিন

লাইভ ক্রিকেট স্কোর