‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের টানাটানি

সারাবাংলা ডেস্ক :
Published:  2016-08-29 01:48:53

‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প নিয়ে দুই মন্ত্রণালয়ের টানাটানি

‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের মেয়াদকাল গত জুনে শেষ হওয়ায় তা নিয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে চলছে টানাটানি।

প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সংস্থা পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের মত হচ্ছে এ প্রকল্পের আওতায় ২৪ লাখের বেশি লোককে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করা হয়েছে।

এবার আরো চার বছর সময় দেয়া হলে ৩৬ লাখের বেশি কমানো যাবে। তাই তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অনুশাসন দিয়েছেন।


অপরদিকে, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বলছে, প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪ পাস হয়েছে।

এর সব সম্পদ ও দায় নিয়ে জুলাই থেকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তাই প্রকল্পটির তৃতীয় সংশোধনী সাংঘর্ষিক।

এর জবাবে ওই আইন সংশোধনের দাবি করেছেন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় সচিব। এ ব্যাপারে পরিকল্পনা কমিশনে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত পিইসি সভায় বলা হয়েছে,

তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪-এর সংশোধিত আইন অনুযায়ী প্রকল্প প্রস্তাব পুনর্গঠন করতে হবে।

তবেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়,

২০২০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার ৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে এবং জনশক্তি ও অর্থনৈতিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিটি বাড়িকে একটি টেকসই কৃষিনির্ভর ইনকাম জেনারেটিং ইউনিটে উন্নীতকরণের উদ্দেশ্যে সরকার ২০০৯ সালে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্প হাতে নেয়।

১ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘ সাত বছরে সারাদেশে ৪৯০টি উপজেলার ৪ হাজার ৫৫০টি ইউনিয়নে ৪০ হাজার ৯৫০টি ওয়ার্ডে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়।

একে আরো দরিদ্র জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যেতে পরবর্তী সময়ে ১ হাজার ৪৯২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানো হয়। তবে মেয়াদ এক বছর কমিয়ে ২০১৩ সাল ধরা হয়।

ঠিক সময় শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় সংশোধনী এনে ব্যয় বাড়িয়ে ধরা হয় ৩ হাজার ১৬২ কোটি টাকা, মেয়াদ তিন বছর বাড়িয়ে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়।

এই সময়ের মধ্যে ৪০ হাজার ৫২৭টি গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা (ভিডিও) গঠনের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৩১ হাজার ৬২০টি হাউস হোল্ডকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

যা ইতিমধ্যেই অর্জিত হয়েছে। তাই এ প্রকল্পকে আরো চার বছর বা ২০২০ সালের জুন পর্যন্ত চালিয়ে যেতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ থেকে তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।

তাতে আরো ৬০ হাজার ৫১৫টি গ্রাম উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে ৩৬ লাখ ৩০ হাজার ৯০০টি হাউস হোল্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আর ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা। যা দ্বিতীয় সংশোধনীর চেয়ে ১৭৬ শতাংশ বেশি।


পরিকল্পনা কমিশন সূত্র জানায়, এসব যাচাই-বাছাই করতে পরিকল্পনা কমিশনে সম্প্রতি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সভাতেই প্রকল্পটি চালিয়ে যাওয়া ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক কার্যক্রমের ব্যাপারে বিপরীতমুখী বক্তব্য উঠে আসে। শুধু তাই নয়, অনেক কিছু বিবেচনা করে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪ পাস হয়েছে তা সংশোধনের দাবি উঠেছে।

জানতে চাইলে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের সদস্য ও বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ এ প্রতিবেদককে বলেন, সরকার আইন করেছে,

১ জুলাই থেকে অটোমেটিকভাবে প্রকল্পের সব সম্পদ ও দায় নিয়ে ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আমরা কাজ শুরু করেছি। ২৯ আগস্ট বোর্ড সভার মিটিংও আছে।

তিনি আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিছু দিন আগে ১০০টি পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক শাখারও উদ্বোধন করেছেন।
এ ব্যাপারে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব বলেন,

  দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য কমাতে ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রকল্পের উপদেষ্টা কাউন্সিলের দ্বিতীয় সভায় সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে,

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর আধিক্য রয়েছে এমন সব গ্রামে পর্যায়ক্রমে এ প্রকল্পের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে হবে। তিনি আরো বলেন,

এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষে প্রকল্প কার্যক্রম চলমান রাখা ও তাদের জন্য নতুন করে ‘সমৃদ্ধ একটি খামার একটি বাড়ি’ নামে প্রকল্প গ্রহণ করার বিষয়ে একটি প্রস্তাব নীতিগত সম্মতির জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে উপস্থাপন করলে তিনি অনুশাসন দেন যে,

ধারণাপত্রে প্রস্তাবিত কার্যক্রম একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করে সারাদেশে বাস্তবায়ন করতে হবে। এরই আলোকে তৃতীয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে।


আর প্রকল্প পরিচালক আকবর হোসেন বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় যারা চরম দারিদ্র্য থেকে উঠে এসেছে তাদের অবস্থাকে টেকসই ও আরো উন্নত করতে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রতি উপজেলা থেকে ৫০ জন করে মোট সাড়ে ২৪ হাজার জন সুবিধাভোগীকে এ সুযোগ দেয়া হবে। তাতে ২৪৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।     


অন্যদিকে, এ প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে সরকার পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪ পাস করে। যা জুলাই থেকে কার্যকর হয়েছে। শুধু তাই নয়, ড. মিহির কান্তি মজুমদারকে তিন বছরের জন্য চেয়ারম্যান এবং প্রকল্প পরিচালককে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে ৯ সদস্যবিশিষ্ট পরিচালনা পর্ষদও গঠন করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ড. মিহির কান্তি মজুমদার বলেন, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক-২০১৪ অনুযায়ী ৩০ জুনের পর থেকে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সব সম্পদ,

স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি, নগদ ও ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ সবই পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে স্থানান্তরিত হওয়ার কথা। তিনি আরো বলেন,

এ প্রকল্পের সংশোধন বা সম্প্রসারণ পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার জবাবে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ সচিব বলেন, 

ব্যাংক আইনের ৩৯ ধারায় ৩০ জুন এ প্রকল্পের কার্যক্রম শেষ করা ও তার সব সম্পদ পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে স্থানান্তরের বিধানটি ২০১৪ সালে একটি বিশেষ প্রেক্ষাপটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাই এটি সংশোধনযোগ্য।


আইন ও বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট উপ-সচিব বলেন, জাতীয় সংসদে অনুমোদিত আইন দেশের সবার জন্য অবশ্য পালনীয়। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪ এতটাই এক্সক্লিউসিভ যে,

এ প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনের প্রস্তাব এ আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সাংঘর্ষিক। তাই আইনটি সংশোধন ছাড়া একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদন সম্ভব নয়।


আর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিব বলেন, সম্প্রতি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ থেকে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪ সংশোধনের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করা হয়েছে।

এর মতামতের জন্য পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত আইন সংশোধনের বিষয়ে পরিষদের সম্মতি ছাড়া ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করবে না বলে তিনি জানান।


সূত্র আরো জানায়, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জন বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করায় ঝুলে গেছে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনীর কাজ। কারণ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য এএন সামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরীর সভাপতিত্বেই পিইসি সভার সিদ্ধান্ত

হয়েছে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটির প্রস্তাবিত তৃতীয় সংশোধনী পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন-২০১৪-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই এর সংশোধনী অনুমোদন প্রক্রিয়াকরণের জন্য ওই আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনপূর্বক সংশোধিত আইন অনুযায়ী সংশোধিত প্রস্তাব (আরডিপিপি) পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি আরো বলেন, ২০১৫ সালের ৮ ডিসেম্বর একনেক সভায় যে

‘সমন্বিত কৃষি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ি এলাকার জনগণের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন’ ও সমবায়ের মাধ্যমে ‘ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার উন্নয়ন’ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে তা এ

প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নের জন্য পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, সরকারি এ প্রকল্পে অপ্রয়োজনীয় যেসব যানবাহন কেনার কথা বলা হয়েছে তা যৌক্তিক পর্যায়ে আনতে হবে।

মন্ত্রণালয় থেকে প্রকল্প ব্যয় ৮ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা চাওয়া হলেও তা কমিয়ে সভায় ৮ হাজার ১০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব করা হলেই প্রকল্পটি সংশোধনে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে। 
 

লাইভ ক্রিকেট স্কোর