গুলশান হামলা: এক বছরে ৮ জঙ্গি নিহত, গ্রেফতার ৪

সারাবাংলা ডেস্ক :
Published:  2017-06-30 05:12:54

গুলশান হামলা: এক বছরে ৮ জঙ্গি নিহত, গ্রেফতার ৪

 রাজধানীর গুলশানে স্প্যানিশ রেস্টুরেন্ট হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার এক বছর কেটে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ এই সময়ে ঘটনার সঙ্গে জড়িত মাত্র চারজনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। হামলার পর গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে অন্তত ৮ জঙ্গি নিহত হয়েছেন। আর পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখনো পলাতক রয়েছেন ৫ জঙ্গি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঘটে যাওয়া ওই ভয়াবহ হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি ২২ নাগরিক প্রাণ হারান। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এ হামলা পরিচিতি পায় ‘ঢাকা অ্যাটাক’ নামে।

ওই ঘটনার পরই দেশব্যাপী জঙ্গিবিরোধী অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, ওইসব অভিযানে এখন পর্যন্ত গুলশান হামলার মাস্টারমাইন্ড তামিম চৌধুরী, নুরুল ইসলাম মারজান, হামলাকারীদের প্রশিক্ষক মেজর জাহিদ, অর্থের যোগানদাতা তানভীর কাদেরীসহ অন্তত ৮ জন শীর্ষ জঙ্গি নিহত হয়েছেন।

এসব জঙ্গিবিরোধী অভিযানে জীবিত অনেককেই গ্রেফতার করা হয়। তাদের মধ্যে গুলশান হামলার মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয় চারজনকে, যাদের কাছ থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হামলায় জড়িতদের বিষয়ে অনেক তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

এখন ওই মামলায় পলাতক আরো ৫ জঙ্গিকে মরিয়া হয়ে খুঁজছে পুলিশ, যাদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করা মামলার জন্য খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে পুলিশ। এরা হলেন, সোহেল মাহফুজ ওরফে হাতকাটা মাহফুজ, রাশেদ ওরফে র্যা শ ও বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গি সোহেল মাহফুজ হলেন গুলশান হামলার অস্ত্র ও গ্রেনেড সরবরাহের মূলহোতা। তিনি জেএমবির পুরাতন ধারার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

জেএমবির শীর্ষ ৬ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হলে সংগঠনটির আমির হন সাইদুর রহমান। ওই সময় জেএমবির শুরা (নীতি নির্ধারণী) কমিটির সদস্য পদ পান মাহফুজ। ২০১০ সালের দিকে সাইদুর রহমান গ্রেফতার হন। এরপর দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থেকে উত্তরাঞ্চলে জেএমবিকে নেতৃত্ব দিয়ে আসছিলেন মাহফুজ।

নারায়ণগঞ্জে নিহত নব্য জেএমবির সমন্বয়ক তামিম আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল। পরে তিনি নব্য জেএমবিতে যুক্ত হন।

এরপর থেকে তিনি নব্য জেএমবির অস্ত্র কেনা, গ্রেনেড তৈরি এবং সরবরাহসহ আইটি শাখার প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে তথ্য পেয়েছে পুলিশ।

আরেক জঙ্গি রাশেদ ওরফে র্যা শ গুলশান হামলার পরিকল্পনাকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন। হামলাকারী ৫ জঙ্গি গুলশান হামলার আগে রাজধানীর বসুন্ধরার যে বাসায় ছিলেন, সেখানে রাশেদের নিয়মিত যাতায়াত ছিল।

জঙ্গি বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট গুলশান হামলায় দুবাই থেকে আসা ১৪ লাখ টাকা বাংলাদেশে গ্রহণ করেন বলে তথ্য রয়েছে তদন্ত সংস্থার কাছে।

দুবাইয়ে পলাতক মুফতি শফিকুর রহমান নব্য জেএমবিকে নিয়মিত অর্থ সহায়তা করতেন। বাশারুজ্জামান ওই অর্থ সংগ্রহ করে মূল সমন্বয়ক তামিমের কাছে পৌঁছে দিতেন।

গুলশান হামলা মামলাটির তদন্ত সংস্থা কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইসলাম পরিবর্তন ডটকমকে বলেন, ‘মামলার তদন্ত করতে গিয়ে আমরা গত এক বছরে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছি। ওই ঘটনায় সরাসরি যারা জড়িত ছিলেন অর্থাৎ যারা হামলা করেছিলেন, তারা সবাই ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন।’

তিনি বলেন, ‘এর বাইরে ওই ঘটনার পরিকল্পনা, সহযোগিতা করা বা নানাভাবে ভূমিকা রেখেছেন এ রকম অনেককে আমরা চিহ্নিত করেছিলাম। তাদের মধ্যে হলি আর্টিজানে হামলায় জড়িত আটজন গত এক বছরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন জঙ্গিবিরোধী অভিযানে নিহত হয়েছেন।’

মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘মামলাটিতে গ্রেফতার করা হয়েছে চারজনকে, যাদের মধ্যে তিনজন নিজেদের সম্পৃক্ততা উল্লেখ করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। আর আমরা এখনো পাঁচজনকে খুঁজছি, তদন্তে তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। ওই পাঁচজনের মধ্যে তিনজন এই মামলার তদন্তের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ আসামি। তাদের খুব বড় ধরনের ভূমিকা ছিল হামলার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায়। তারা হলেন, সোহেল মাহফুজ, রাশেদ ওরফে র্যা শ এবং বাশারুজ্জামান ওরফে চকলেট। তাদের ধরতে পারলেই তদন্তকাজ শেষ করতে পারব।’

তিনি আরো বলেন, ‘মামলার তদন্তকাজ অনেকটাই এগিয়েছে। মামলাটির তদন্তে পোস্টমর্টেম রিপোর্ট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হলি আর্টিজানে হামলায় ভিকটিম যারা মারা গিয়েছেন, গত ১৯ জুন আমরা তাদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট হাতে পেয়েছি। হামলাকারীদের পোস্টমর্টেম রিপোর্ট এখনো হাতে পাইনি, সেটি প্রক্রিয়াধীন বলে আমরা জানতে পেরেছি। রিপোর্ট পেলে এবং অবশিষ্ট পাঁচজনকে অথবা তাদের মধ্যে দু’একজনকে গ্রেফতার করতে পারলেই তদন্তকাজ শেষ করে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করার চেষ্টা করা হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘হাসনাত করিম এখনো এই মামলার সাসপেক্টেড আসামি। সে কারণেই তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে এবং এখন তিনি কারাগারে আছেন। তদন্ত শেষেই তার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে আমরা জানাতে পারব।’

প্রসঙ্গত, গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে আগামীকাল শনিবার (১ জুলাই)। ভয়াবহ ওই হামলায় দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ দেশি-বিদেশি ২২ নাগরিক প্রাণ হারান।

নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি, একজন ভারতীয়, ৯ জন ইতালীয় এবং সাতজন জাপানি নাগরিক। প্রায় ১২ ঘণ্টার ওই ‘জিম্মি সংকট’ শেষ হয় সেনাবাহিনীর কমান্ডো অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’র মাধ্যমে।

অভিযানে পাঁচ জঙ্গি ও রেস্টুরেন্টের বাবুর্চি সাইফুল ইসলাম চৌকিদার নিহত হন। নিহত জঙ্গিরা হলেন, নিবরাস ইসলাম, মীর সামিহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জল ওরফে বিকাশ।

লাইভ ক্রিকেট স্কোর