রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিতর্কিতরা

সারাবাংলা ডেস্ক
Published:  2017-06-24 12:08:34

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে বিতর্কিতরা

আংশিক কমিটি ঘোষণার ছয় মাস পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দিয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সোমবার সন্ধ্যায় কমিটি অনুমোদন হলেও পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশে লুকোচুরি করছেন ছাত্রলীগ নেতারা।

খোদ দলীয় নেতাদের অভিযোগ- ‘২৫১ সদস্যের ঢাউস কমিটি করা হলেও প্রকাশ করা হয়েছে ১১০ জনের তালিকা।’ তাতে শুধুমাত্র সহ-সভাপতি রাখা হয়েছে ৬০ জনকে!

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের একজন সহ-সভাপতিসহ তিনজন শীর্ষ নেতা জানান- ‘গঠনতন্ত্র লংঘন করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের ঢাউস কমিটি করা হয়েছে। কিন্তু তাতে কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এসএম জাকির হোসাইন কীভাবে অনুমোদন দিলেন, তা তাদের বোধগম্য নয়।’

এদিকে সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষিত আংশিক কমিটির নেতাদের পদের অবনমন করায় চরম বিতর্কে পড়েছে অনুমোদিত কমিটি। আর ছাত্রদল-শিবির নিয়ে কমিটি গঠনের অভিযোগ তুলছেন খোদ কমিটির একাধিক পদধারী নেতা। কমিটিতে রয়েছে ড্রপ আউট, ছাত্রত্ব শেষ হওয়া এবং বিবাহিতরাও।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর রাবি শাখা ছাত্রলীগের ২৫তম সম্মেলনের তিনদিন পর গোলাম কিবরিয়াকে সভাপতি এবং ফয়সাল আহমেদ রুনুকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৩ সদস্যের আংশিক কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। ছয়মাস পর গত ১৯ জুন সন্ধ্যায় পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন করে ছাত্রলীগ।

কমিটির সদস্য সংখ্যা নিয়ে লুকোচুরি: ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় শাখাগুলো জেলা ইউনিটের মর্যাদা পেয়ে থাকে। ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন শাহজাদা জানান, ‘গঠনতন্ত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা শাখার ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির করার নিয়ম রয়েছে।’

রাবি শাখার ২৫১ সদস্যের কমিটি কিভাবে করা হলো- এমন প্রশ্নে, তিনি বলেন, ‘আমার জানামতে, রাবি ছাত্রলীগেও ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরে বেশি করা হতে পারে। সেটা আমার জানা নেই।’

অনুমোদনের পর রাবির সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু তার ফেসবুক অ্যাকউন্টে কমিটির তালিকার ৬টি পাতা আপলোড করেন। সেখানে সদস্য সংখ্যা ১১০।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি গোলাম কিবরিয়া ও সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ রুনু স্বীকার করেন, ‘১৫১ সদস্যের কমিটিতে সদস্য কিছু বেশি হওয়ায় সবার তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।’

নেতৃত্বে সেই বিতকির্তরাও:

শুধুমাত্র সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় নতুন কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন অছাত্র, বহিস্কৃত ও ছাত্রদলের অনুপ্রবেশকারীরাও। অথচ খসড়া কমিটিতে ছাত্রদল, শিবির, অছাত্র ও বহিস্কৃতরাও রয়েছে এমন সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশ হলে তা আমলে নেয়নি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। খসড়া তালিকা অনুযায়ী বিতর্কিতদের নিয়ে করা কমিটি অনুমোদন করেছেন তারা।

কমিটি ঘেঁটে দেখা গেছে- ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের মো. মাহফুজুর রহমান (এহসান) পেয়েছেন সহ-সভাপতি পদ। তিনি ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রদলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিল। নাশকতার মামলায় রাবি সংলগ্ন অক্ট্রয় মোড় এলাকা থেকে গ্রেফতার হয়ে জেলও খেটেছেন তিনি। মতিহার থানায় এখনো তার নামে মামলা রয়েছে। নিজ বিভাগের ছাত্রীর করা নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামিও সে।

সাইফ ইবনে করিম (রুপম) পেয়েছেন যুগ্ম-সম্পাদক পদ। ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স বিভাগে ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হলেও অনিয়মিত হওয়ায় দুই বছর আগে ‘ড্রপ আউট’ হয়ে ছাত্রত্ব খুঁইয়েছে সে। সহ-সভাপতি পদ পাওয়া সুরঞ্জিত প্রসাদ বিত্তও তিন বছর আগে ড্রপ আউট হয়ে ছাত্রত্ব হারিয়েছে।

আবু খায়ের মোস্তফা (রিনেট) ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির পূর্বে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মিজানুর রহমান মিনুর হাত থেকে ফুল নিয়ে ছাত্রদলে যোগ দেন। ওই ছবিসহ গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হলেও তাতে ভ্রুক্ষেপ না করে তাকে ছাত্রলীগে সহ-সভাপতি পদ দেওয়া হয়েছে। আরেক সহ-সভাপতি ইকবাল হোসেন হিরক অস্ত্র মামলার আসামি। বেশ কয়েক বছর আগে তার পড়ালেখা শেষ হয়ে গেছে।

সহ-সভাপতি পদ পাওয়া রবিউল আওয়াল মিল্টন, এরশাদুর রহমান রিফাত, রেজয়ানুল হক হৃদয়, আরিফ বিন জহির অপকর্মের দায়ে দল থেকে স্থায়ী বহিস্কার হয়েছিল। আরেক সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান সিনহা বিবাহিত বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ স্বচ্ছ ইমেজের কর্মীদের অবমূল্যায়ণ করে বহিস্কৃতদের ফের পদায়ন করা হয়েছে।

যুগ্ম-সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন সজীব রাবি গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি বাসুদেব পালকে পিটিয়ে পা ভাঙার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিস্কার হয়। পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে ভুক্তভোগীকে প্রশাসনকে দেয়া অভিযোগ তুলে নিতে বাধ্য করে। শাহ্ মখদুম হলের প্রাধ্যক্ষকে হুমকি দেয়ায় মুশফিক তাহমিদ তন্ময়ের বিরুদ্ধে মতিহার থানা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন প্রাধ্যক্ষ। তাকেও কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রাখা হয়েছে।

এছাড়া রাবি শাখার সভাপতি পদ পাওয়া বোরজাহান আলী ও মাসুম মিলন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগেরও বর্তমান সহ-সভাপতি। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জেলা শাখার মর্যাদার সমান। ফলে একই সঙ্গে দু’টি শাখার একই পদে রয়েছেন তারা।

এদিকে সভাপতি-সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ না হওয়ায় ত্যাগী ছাত্রলীগ কর্মীরা পদবঞ্চিত হয়েছে। সম্মেলনে যারা বর্তমান সভাপতি-সম্পাদকের হয়ে কাজ করেনি, তাদেরকেও পদ দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ দলীয় নেতাকর্মীদের। দলে যুক্ত হয়ে ৩-৫ মাস রাজনীতি করা হাইব্রিড কর্মীরা অন্তত ৫০ শতাংশ পদ পেয়েছেন।

পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পাল্টে গেল পদক্রম:

গত ৮ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলনের পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ তিনজন সহ-সভাপতি, চারজনক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও চারজনকে সাংগঠনিক সম্পাদক করে আংশিক কমিটি ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদ দু’টি ঠিক থাকলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পাল্টে গেছে বাকিদের পদক্রম।

আংশিক কমিটির ১নং সহ-সভাপতি কাজী আমিনুল হক লিংকনের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে জায়গা হয়েছে ১৮ নম্বরে। ২নং সহ-সভাপতি পদে থাকা সৈকত হোসাইন দেয়া হয়েছে ১৯ নম্বরে। সহ-সভাপতির ৩নং থাকা হাবিবুল্লাহ নিক্সনকে পাঁচ নম্বরে। ১নং যুগ্ম-সম্পাদক মিজানুর ইসলামকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে ৯ নম্বরে। ২,৩ ও ৪ নম্বরে থাকা যুগ্ম-সম্পাদক ফয়েজ আহমেদ, মামুন শেখ ও শাহিনুল সরকারকে নামানো হয়েছে যথাক্রমে ৭,৮ ও ১০ নম্বরে।

১নং সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল মোমিনকে নামানো হয়েছে ৩ নম্বরে। আর ৩ ও ৪ নম্বরে থাকা এনায়েত হক ও রেজাউল করিম রাজুকে নামিয়ে দেয়া হয়েছে যথাক্রমে ১০ ও ৯ নম্বরে। তবে সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় প্রথম ঘোষিত কমিটিতে দুই নম্বরে থাকা সাবরুন জামিল সুষ্ময়কে এগিয়ে আনা হয়েছে ১ নম্বরে।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, এর আগে কোনো কমিটিতে এ ধরণের ঘটনা ঘটেনি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ প্রথমে যে ক্রমিক অনুযায়ী অনুমোদন দিয়েছিল, পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সেটি পাল্টে যায় কিভাবে? তবে রাবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক রুনুর দাবি, ‘গঠনতন্ত্রে এ ধরণের কোনো বিধি-নিষেধ নেই।’

কমিটি ঘোষণার পর রাবি ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী আমিনুল হক লিংকন, সৈকত হোসাইন, যুগ্ম-সম্পাদক শাহিনুল ইসলাম সরকার, সাংগঠনিক সম্পাদ রেজাউল করিম রাজু তাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন- ‘ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, অছাত্র ও বহিস্কৃতদের কমিটিতে এনে আমাদের ধন্য করেছেন এবং আপনাদের ক্ষমতা দেখিয়েছেন। যারা আপনাদের নেতা বানিয়েছে, তাদের সম্মান কতটুকু রাখতে পারলেন বিবেককে প্রশ্ন করে দেখেন।’

লাইভ ক্রিকেট স্কোর